আজ ভারতবর্ষের 76 তম প্রজাতন্ত্র দিবসে স্বামী পরমানন্দজীর দেশ, সমাজ , রাষ্ট্র ও তার জনগণকে নিয়ে কিছু আলোচনা দেওয়া হল, যা সর্বকালের,সর্ব দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং অনুসরণীয়----
জাতি, সমাজ ও রাষ্ট্র
প্রিয় আত্মন্।
রাষ্ট্রীয় চেতনায় যখন জাতি অনুপ্রাণিত হয়, তখনই হয় রাষ্ট্রীয় জাগরণ এবং রাষ্ট্রীয় কল্যাণ।
রাষ্ট্রীয় সংহতি এবং কল্যাণের মূল হল রাষ্ট্রকে ভালোবাসা, রাষ্ট্রকে ভাবা, রাষ্ট্রকে জানা, রাষ্ট্রকে বোঝা এবং রাষ্ট্রের স্বার্থে আপন স্বার্থত্যাগ।
চরম সংকট ও দুঃসহ অবস্থার ভিতর দিয়ে মানবজাতি জেগে ওঠে। যখন সমাজের অবস্থা অসহনীয় বোধ হয়-জাতি আদর্শচ্যুত হয়-দেশ ভ্রষ্টাচারদুষ্ট হয়ে পড়ে, তখনই কোন মহামানবকে কেন্দ্র করে হয় মানব-জাগরণ ও সংস্কৃতির উন্মেষ বা নবজাগরণ।
সঙ্কট থেকে আসে হতাশা, হতাশা থেকে হয় ক্ষোভ, ক্রমে ক্ষোভ থেকে হয় বিক্ষোভ, তারপর বিক্ষোভ বেড়ে গিয়ে হয় বিদ্রোহ আর এই বিদ্রোহ সুনেতৃত্ব পেলে হয় বিপ্লব। তখনই হয় রূপান্তর বা নবজাগরণ।
প্রাণশক্তির দুর্বার গতি এবং প্রাণ-প্রাচুর্য অস্থির ও বেগবান। তাই প্রাণ-প্রাচুর্যের গতিবেগ যদি জীবনমুখী হয়, তাহলে দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধিত হয়। শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্য, বিজ্ঞান প্রভৃতি সৃজনমুখীভাব প্রাপ্ত হয়। প্রাণের উৎকর্ষে জীবনে আসে সভ্যতার জোয়ার। আর যদি প্রাণ-প্রাচুর্যের গতি হয় জীবনবিরোধী, তাহলে নেমে আসে জাতির জীবনে চরম সর্বনাশ। প্রচারে আপন অস্তিত্বের সম্বন্ধে মানবকে সচেতন করে তোলা এবং মানবজাতিকে আত্মসচেতন করে তোলা ও আপন অধিকারলাভে মানবজাতিকে প্রয়াসী করে তোলাকে বিপ্লব বলা যায়।
মানবজাতিকে আত্মবিস্মৃত ভাব হতে আত্মসচেতন করে তোলাই প্রকৃত বিপ্লব বা বিপ্লবাত্মক অগ্রগতি।
রাষ্ট্রীয় চেতনাবোধ না হলে কোন জাতি আপন রাষ্ট্রকে সর্বাঙ্গীণ প্রগতি বা উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে পারে না। মানব নিজস্বার্থ বিস্মৃত হলে বা ক্ষুদ্র স্বার্থের গণ্ডি আসলে বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় চেতনাবোধ বৃহত্তর জাতীয় ভাবনায় মানব জাগ্রত হয়। উদ্বুদ্ধ হয়ে থেকে বের হয়ে রাষ্ট্রীয় বোধে বা রাষ্ট্রীয় সেবায় আপনাকে নিবেদন করে। সে দেশের সেবা ও কর্মে আত্মনিয়োগ করে।
আত্মবিস্মৃত, স্বার্থান্ধ, জড়মস্তিষ্ক, ও মানসিক বৈকল্যপ্রাপ্ত মানব তমসাবৃত। তারা কি বিপ্লবসূচী গ্রহণ করবে-বিপ্লবের নামে হৈ চৈ শুধু! এটা শুধু পৈশাচিক প্রতিক্রিয়ামূলক একটা উল্লাস বা সোরগোল। সোরগোল।
আত্মবিস্মৃত মানবজাতি কোনদিন প্রকৃত বিপ্লবসূচী গ্রহণ করতে পারে না বা সৃজনমুখী কলার অনুশীলন করতে পারে না। পক্ষান্তরে তারা ধ্বংসমুখী পথে অগ্রসর হতে থাকে। ব্যক্তি নিয়ে সমাজ আর সমষ্টি-সমাজ নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়। সমষ্টির উন্নয়ন রাষ্ট্রের উন্নতি সাধন করে। ব্যক্তির আত্মসচেতনতা রাষ্ট্রীয় চেতনাবোধ জাগ্রত করে। ব্যক্তির আত্মসচেতনতায় সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে এবং সামাজিক সংহতির দিকে অগ্রসর হতে থাকে মানবসমাজ। সমাজের সংহতি বা একতাবোধ পূর্ণাঙ্গ আদর্শ রাষ্ট্র গড়ে তোলে।
মানবসমাজ আপনি আপনার সংস্কার করে নেবে, শুধু প্রয়োজন আত্মসচেতনতা। আত্মসচেতন হলে রাষ্ট্রীয় ভাবনা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ আপনা-আপনি উপস্থিত হবে।
ব্যক্তির আত্মবিস্মৃতির ঘন অন্ধকার বা অজ্ঞানতা কাটিয়ে তাকে আত্মসচেতন করতে হলে চাই সৃজনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা, চাই জীবনমুখী শিক্ষার পরিকল্পনা।
চরিত্র গঠনের উপর ব্যক্তিত্ব এবং ব্যক্তিত্বের উপর সমাজ আর সমাজের সংহতির উপর রাষ্ট্রীয় অগ্রগতি বা মানব- জাতির উন্নতি সম্ভব।
চরিত্রবান ব্যক্তি না হলে প্রশাসন ঠিকমত চলতে পারে না। চরিত্রহীন কপট ব্যক্তির হাতে রাষ্ট্রীয় ভার পড়লে রাষ্ট্রের অবনতি অনিবার্য এবং রাষ্ট্রের তথা জনগণের দুর্গতি উপস্থিত হয়। নির্দোষ ব্যক্তি কারাগারে কালাতিপাত করে আর দোষীরা মর্যাদা সহকারে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করে। ন্যায়, সত্য, সাহস, বিনয়, সংযম, শ্রম, ত্যাগ, দয়া, ক্ষমা, সেবা ও কল্যাণ মর্যাদা হারায় বা লাঞ্ছিত হয়।
পক্ষান্তরে কাপুরুষতা, চাটুকারিতা, ফাঁকিবাজি, কপটতা, অভিনয়, কৃত্রিমতা ও মিথ্যা প্রতিষ্ঠা বা মর্যাদা পায় সমাজে। অরাজকতা দেখা দেয়। ধূর্ত বা শঠতা বৃদ্ধি পায় সমাজে। দুর্বৃত্তরা সাধারণের সম্পত্তি ও সামর্থ্য অধিকার করে নেয় অন্যায়ভাবে। সাধারণ মানুষ নির্যাতিত হয়। সামাজিক শোষণ ও রাষ্ট্রীয় নিষ্পেষণ দ্বারা জনজীবন অচল বা পঙ্গু হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের চরম বিপর্যয় ও সংকট দেখা দেয়।
চরিত্রহীন ব্যক্তি আপন নির্বুদ্ধিতায় ও লালসায় স্বৈরাচারী হয়ে পড়ে। আগে না ভেবে অনেক কুকর্ম করে ফেলে আর পরে তার পরিণাম ও কুফল রাষ্ট্র ও দেশবাসীর উপর নেমে আসে, দেশবাসী দুর্গতি ভোগ করে।
চরিত্রহীন পাষণ্ডের কপট হৃদয়ে রাষ্ট্রের বা দেশবাসীর দুঃখ ও বেদনা অনুভূত হয় না। তার কপট অন্তঃকরণে দেশবাসীর সুখ-দুঃখ রেখাপাত করে না। সে আত্মস্বার্থে রাষ্ট্রের বা দেশবাসীর বিপুল অনিষ্ট করে। আপন স্বার্থে নিজের হঠকারিতার অপরাধে সমগ্র রাষ্ট্রের বা দেশবাসীর সর্বনাশ করে।
চরিত্রবানের অভাবে সমাজ উচ্ছৃঙ্খল ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে পড়ে। শৃঙ্খলাবিহীন উচ্ছৃঙ্খল সমাজে আসে স্বেচ্ছাচার আর স্বৈরাচারীদের শোষণ ও নিষ্পেষণে, অরাজকতায় ও অত্যাচারে রাষ্ট্রজীবন দুর্বিসহ হয়ে পড়ে।
এখন আর সমাজসংস্কার নয়, সমাজের সেবায় আত্মনিয়োগ বা পূজা। সমাজ নিজের সংস্কার নিজেই করে নেবে।
সমাজে শান্তি ও কল্যাণ আসবে এবং সমাজ সুস্থ হবে তখনই যখন প্রেমকে কেন্দ্র করে সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে। প্রেমের ভিত্তির উপর মানবের সভ্যতা গড়ে না উঠলে সমাজের মঙ্গল ও কল্যাণ হতে পারে না।
সমাজের অশান্তির মূলে প্রেমহীনতা। প্রেমের উপর ভিত্তি করে সমাজ গড়ো। ----- স্বামী পরমানন্দজী
('জীবন পথের পাথেয়'--- থেকে সংগৃহীত)
রায়না তপোবন আশ্রমের পক্ষ থেকে সকলকে প্রজাতন্ত্র দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা রইল। জয় হিন্দ, বন্দে মাতরম ।